ArabicBengaliEnglishHindi

পঞ্চগড়ের বোদায় পাঁচপীরে বদ্ধভূমিটি পড়ে আছে অযত্ন অবহেলায়


প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৩, ২০২২, ৪:৫১ অপরাহ্ণ / ৫৩
পঞ্চগড়ের বোদায় পাঁচপীরে বদ্ধভূমিটি পড়ে আছে অযত্ন অবহেলায়

মাজহারুল ইসলাম পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ– মুক্তিযুদ্ধের উষালগ্নে সময়টা ছিল ১৯৭১, ১৪ এপ্রিল মাস। দেশে ততক্ষণে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মুক্তিসেনারাও সংগঠিত হচ্ছিল। পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে গ্রামে টহল জোরদার করেছে। তাদের ভয়ে এপ্রিলে হাজার হাজার মানুষ ভারতের উদ্দেশে ছুটছে।

পাকিস্তানি সেনারা ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করা অন্তত তিন হাজার ব্যক্তিকে ধরে এই বধ্যভূমি সংলগ্ন আমবাগান মাঠে সমবেত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে লাশগুলো এই বধ্যভূমির পাশে থাকা পুকুরে ফেলা হয়। সেদিনের কথা মনে হলে আজও চোখে পানি চলে আসে। পরিচিত কত মানুষকে সেদিন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।’ বধ্যভূমির জরাজীর্ণ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সত্যেন্দ্রনাথ রায়।

বলছিলেন দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে বোদা উপজেলা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে পাঁচপীর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের বধ্যভূমির কথা। স্থানীয়রা বিলটিকে ঢাপঢুপ নামেই চেনেন। শুকনো মৌসুমে এটি খালে পরিণত হলেও বর্ষায় এটি পানিতে পূর্ণ থাকে। সেই হিসাবে এটিকে ‘ঢাপঢুপ বধ্যভূমি’ হিসাবেই চেনেন সবাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঢাপঢুপ বিলেই হাজার হাজার মানুষকে কোদাল দিয়ে কেটে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কোনো রকম সৎকার ছাড়াই পাকিস্তানি সেনারা সেদিন লাশগুলো মাটিচাপা দেয়।

কথা হয় কয়েকজন এলাকাবাসীর সঙ্গে। তারা জানান, বছর দশেক আগে এখানকার খাল খনন করতে গিয়ে অসংখ্য মানুষের হাড় পাওয়া যায়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক এবং জেলা পরিষদের উদ্যোগে এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের জন্য স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। এমন ঐতিহাসিক জায়গাটি সংরক্ষণে দৃশ্যমান আর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

এলাকাবাসীর দাবি, মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির এমন করুণ আত্মনিবেদনের স্থানটি তরুণ প্রজন্মের জন্যই ভালোভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। তাহলেই তরুণ প্রজন্ম জানতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার ইতিহাস।

রোববার সেখানে গিয়ে বধ্যভূমির জীর্ণদশা চোখে পড়ে। রাস্তা থেকে ৩০ ফুট দূরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিস্তম্ভটি। বধ্যভূমিতে যাওয়ার মাটির আইলসদৃশ্য রাস্তাটির অবস্থাও করুণ। অযত্ন-অবহেলায় বধ্যভূমির গায়ে ঠিক কি লেখা আছে, সেটি উদ্ধারেও বেগ পেতে হয়। অনেক কষ্টে দেখা গেল, স্মৃতিস্তম্ভে লেখা রয়েছে-‘দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব / বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে…/ -মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এই বধ্যভূমির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাবু সপেন্দ্রনাথ। প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোককে রাজাকারদের সহায়তায় ধরে এনে হত্যা করে এই পুকুরে ফেলা হয়। তিনি নিজেও তাদের নির্মমতার শিকার হয়ে সৌভাগ্যক্রমে কয়েকটি লাশের নিচ থেকে উঠে আসেন, শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান। বধ্যভূমির স্তম্ভটির পরিকল্পনা করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক এবং ব্যবস্থাপনায় ছিলেন জেলা পরিষদ পঞ্চগড়।’ স্মৃতিস্তম্ভে কিছু অংশ ভেঙে গেছে, পলেস্তারা খসে পড়েছে। আশেপাশে মানুষের মলমূত্র। মার্বেল পাথরের নামফলকের একটি আছে, অন্যটি নেই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া স্থানীয় অধিবাসী শিক্ষক ইউসুফ আলী বলেন, ১৯৭১ সালের এপ্রিলের এক শুক্রবার হঠাৎ করে শোনা গেল পাকিস্তানি সেনারা মানুষ হত্যা করছে। এ খবরে বাড়ির সবাই মিলে পাশের কাউন খেতে আশ্রয় নিই। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, বেশকিছু ঘড়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিকালে খেলতে খেলতে ঢাপঢুপ বিলের দিকে আসি। তখন দেখি পুকুরভর্তি লাশ।

কেউ মারা গেছেন, কেউ অর্ধমৃত। তাদের রক্তে পুকুরের পানি সেদিন টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করে। এলাকার আরেকজন সচেতন নাগরিক শিক্ষক মো. ইছা রহুল্লা বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এমন ঐতিহাসিক স্থানটিকে সংরক্ষণ করা হয়নি এটা অত্যন্ত বেদনার। স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করা অতীব জরুরি। ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির প্রধান যুগান্তরকে বলেন, ঢাপঢুপের বধ্যভূমিটি অবশ্যই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। আমি বেশ কয়েকবার উপজেলা পরিষদে বিষয়টি তুলে ছিলাম কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে নাঠুয়া পড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমানের সাথে আলোচনায় তিনি বলেন,১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাঁচপীর এলাকার হাজার হাজার হিন্দু মুসলমান নিরস্ত্র বাঙ্গালী সেদিন খান সেনাদের তান্ডম লিলার ভয়ে ঢাবঢুপের আমবাগানে বসে আশ্রয় নিয়েছিল।কিন্তু আলবদর রাজাকারদের মাধ্যমে এ খবর খান সেনাদের কাছে পৌছে দিলে তারা দ্রুত এসে অতর্কিত আক্রমন চালিয়ে নৃশংসভাবে হাজার হাজার হত্যা করে বদ্ধভুমিতে ফেলে চলে যায়।দেশ স্বাধিনের পর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান বিএসসি ও স্থানীয় কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও গন্যমান্য ব্যাক্তিদের নিয়ে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু করেন।এতে মাননীয় রেলপথ মন্ত্রী এ্যাডঃ নুরুল ইসলাম সুজন( এমপি) মহোদয় উপস্থিত ছিলেন।বর্তমানে এই স্মৃতিসৌধটি অসম্পুর্ন  অর্ধ নির্মিত অবস্থায় অবহেলায় পড়ে রয়েছে।এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিচেতনাবাহী  সুধি সমাজ স্মৃতিসৌধটি সম্পন্ন করার জোর দাবী জানিয়েছেন।

%d bloggers like this: