ArabicBengaliEnglishHindi

রিজার্ভ থেকে তহবিলের অর্থ বাদ দিতে হবে


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৮, ২০২২, ৬:৫৬ অপরাহ্ণ / ১৩
রিজার্ভ থেকে তহবিলের অর্থ বাদ দিতে হবে

নিজস্ব প্রতিনিধি:- আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি নিয়ে ঘোর আপত্তি তুলেছে। তারা রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণ করতে বলেছে।

ডলারের একাধিক দর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এতে আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে। ডলারের দরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন পদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করার কথা বলেছে। সাইবার নিরাপত্তা আরও বাড়াতে হবে। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেছে। যেসব খাতে নীতিগত ছাড় দিয়ে প্রচলিত ব্যবস্থাকে সংশোধন করা যায় সে বিষয়েও মতামত তুলে ধরেছে। ঢাকা সফররত আইএমএফ মিশনের সঙ্গে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের সার্বিক

অবস্থা নিয়ে গভর্নরসহ বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে ছয়টি বৈঠক হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে প্রথম বৈঠকে আইএমএফ’র মিশন প্রধান রাহুল আনন্দ নেতৃত্ব দেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল, কাজী ছাইদুর রহমান, সাজেদুর রহমান খান ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাবিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আইএমএফ মিশনের সদস্যরাও ছিলেন। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ বলেন, বৈঠকে রিজার্ভ নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে যার যার অবস্থান থেকে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রিজার্ভের হিসাব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে করার পরামর্শ দিচ্ছে আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই হিসাব করছে। তবে এ নিয়ে আইএমএফ’র সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। সেটি নিয়েই আলোচনা হচ্ছে।

বৈঠকে আইএমএফ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে আলাদাভাবে বিভিন্ন তহবিল গঠন ও সেখান থেকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। আবার ওইসব অর্থ রিজার্ভে দেখানো হচ্ছে। এতে রিজার্ভ বেশি দেখানো হচ্ছে। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে রিজার্ভের হিসাব দেখানো ঠিক হচ্ছে না। এতে দেশের প্রকৃত রিজার্ভের চিত্র ফুটে উঠছে না। বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি রিজার্ভ প্রদর্শন হচ্ছে। রিজার্ভের প্রকৃত চিত্র আড়াল করায় বাংলাদেশেরই বরং ঝুঁকি বাড়ছে।

হিসাবের এই গরমিল বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জানতে পারলে আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থেই এ হিসাব আন্তর্জাতিক মানে করা উচিত। তারা আরও বলেছেন-ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ আইএমএফ’র সদস্য সব দেশই আইএমএফ’র প্রচলিত আন্তর্জাতিকমান মেনে রিজার্ভের হিসাব করে এবং তা প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশ রিজার্ভের হিসাবের ক্ষেত্রে আইএমএফ’র মান মানছে না। তারা নিজেদের মতো করে হিসাব করে বেশি রিজার্ভ দেখাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, রিজার্ভের হিসাব বাংলাদেশ দুভাবে করছে। গ্রস ও নিট হিসাব। গ্রস হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে দেখানো হচ্ছে। নিট হিসাবে বিভিন্ন তহবিলের অর্থ বাদ দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে ৮০০ কোটি ডলারের চারটি তহবিল গঠন করেছে। এর মধ্যে ৭০০ কোটি ডলার রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) আছে। শিল্প খাতে যন্ত্রপাতি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে গঠিত একটি তহবিলে জোগান দিয়েছে ৪৫ কোটি ডলার। শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২০ কোটি ডলারের একটি তহবিল ও ২০ কোটি ইউরোর আরও একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এছাড়া শ্রীলংকাকে ঋণ দেওয়া হয়েছে ২৫ কোটি ডলার। এসব অর্থও রিজার্ভে দেখানো হচ্ছে।

আইএমএফ বলেছে, এগুলো রিজার্ভে দেখানো যাবে না। কেননা এসব অর্থ অন্য খাতে বিনিয়োগ করা। যখন খুশি তখন এগুলো ব্যবহার করা যাবে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, তহবিলগুলোর বেশিরভাগ অর্থই অব্যবহৃত। সেগুলো রিজার্ভে দেখাতে সমস্যা নেই।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫৮৫ কোটি ডলার। বিভিন্ন তহবিলে বরাদ্দ অর্থ বাদ দিলে তা ৩ হাজার কোটি ডলারের নিচে নেমে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক খাতে সংস্কার চলমান। রিজার্ভের বিষয়ে যে বিতর্ক তা আংশিক সত্য। নগদ রিজার্ভ কিছুটা কমে গেছে। তবে ৮০০ কোটি ডলারের যে তহবিল রয়েছে সেটাও তো রিজার্ভ। বাদ দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে আলোচনা করে যেটুকু নমনীয় হওয়া যায় তা হবে।

বৈঠকে আইএমএফ ডলারের একাধিক দর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলেছে, ডলারের দর একাধিক থাকায় কোনটি কে পাবে সেটি নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এতে বহুমাত্রিক দর কমিয়ে আনার পক্ষে আইএমএফ। তাদের মতে, ডলারের একটি ইউনিক দর থাকা উচিত। যেটি বাংলাদেশে নেই।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ডলার বিক্রি করছে ৯৭ টাকা দরে। এর বাইরে ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব দর নির্ধারণ করে। এটি বিভিন্ন খাতে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। আইএমএফ বলেছে, ৯৭ টাকা দরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনে তা গ্রাহকের কাছে ব্যাংক বিক্রি করছে ১০৩ থেকে ১০৬ টাকায়। এতে ৬ থেকে ৯ টাকা মুনাফা হচ্ছে। এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ। তারা বলেছে, ডলারের দরের মধ্যে সমন্বয় আনা জরুরি। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ডলারের দামে অস্থিরতার কারণে এ বৈষম্য দেখা দিয়েছে। এটি ধীরে দীরে ঠিক হয়ে যাবে।

%d bloggers like this: