ArabicBengaliEnglishHindi

নরসিংদীর আ.লীগ রাজনীতিতে গ্রুপিংয়ের ইতি ঘটানোর বার্তা তৃণমূলে।


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২২, ২০২২, ১:৫৭ পূর্বাহ্ণ / ৫৪
নরসিংদীর আ.লীগ রাজনীতিতে গ্রুপিংয়ের ইতি ঘটানোর বার্তা তৃণমূলে।
নরসিংদী প্রতিনিধি
তাঁত শিল্পের মেলা নরসিংদী জেলা খ্যাত জনপদ। এ জেলায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ কাপড় ও সবজি উৎপন্ন এবং রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় নিঃসন্দেহে নরসিংদী একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের দুর্গ খ্যাত হিসেবে নরসিংদী জেলার ৫টি আসনই বর্তমান আওয়ামী লীগের দখলে। টানা তিনবার সদর আসনের সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু (বীর প্রতীক) ও নরসিংদী-৫ ( রায়পুরা) থেকে ছয়বারের সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা বর্ষীয়ান নেতা রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু এবং টানা তিনবার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে জেলা আওয়ামী লীগ একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল। একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণেই দলের অভ্যন্তরে শুরু হয় ক্ষমতার প্রভাব আর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে জেলা আওয়ামী লীগ ও তাঁর সহযোগী সংগঠন গুলো দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জেলা আওয়ামী লীগের একাংশে রায়পুরার সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু ও সদরের সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু (বীর প্রতীক) এবং অপরাংশে মনোহরদীর সাংসদ বর্তমান শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন ভূঁইয়া ও সাবেক পৌর মেয়র কামরুজ্জামান নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাজনীতির মাঠে দু’ভাগেই লবিং গ্রুপিং সর্বক্ষেত্রে। বিগত ২০১১ সালের ১ নভেম্বর পৌর মেয়র লোকমান হোসেনকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে একটি মহল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে বেশকিছু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তৎকালীন সময়ে সাবেক প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু ও জেলা আ.লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঁইয়া এ হত্যার বিচারের দাবীতে সম্মুখভাগে নেতৃত্ব দেন। ঐ সময় থেকেই জেলা আ.লীগের সভাপতি এড. আসাদুজ্জামান জামান ও সাবেক মন্ত্রী রায়পুরা-৫ আসনের সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু ও সদরের সাংসদ হিরু, জেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিন ভূঁইয়া ও পৌর মেয়র (হত্যা মামলার বাদী) কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে জেলা আওয়ামী লীগ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরে রাজুকে মন্ত্রীত্ব থেকে বাদ দিয়ে হিরুকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে জেলা আ.লীগের সম্মেলনে আ.লীগের দুঃসময়ের নেতা জেলা আ.লীগের সভাপতি এড.আসাদুজ্জামানকে বাদ দিয়ে হিরু সভাপতি হন। এড.আসাদুজ্জামান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে মৃত্যুবরণ করলে উক্ত আসনে হিরুপন্থী আবদুল মতিন ভূঁইয়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এতে করে আসাদুজ্জামানপন্থীরা রাজনীতির মাঠে কোন ঠাঁসা হয়ে পড়েন। হিরু, মতিন, কামরুলপন্থীরা বিগত সময়ে ইউপি নির্বাচন থেকে শুরু করে দলীয় মাঠ সম্মেলনে রাজু-আসাদুজ্জামানপন্থী নেতাদের বাদ দিয়ে নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত করেন। তাদের একক দৌরাত্ম্যে রীতিমতো তৃণমূল নেতারা কোনঠাঁসা হয়ে পড়েন। হিরু প্রতিমন্ত্রী থেকে বাদ পড়ার পর তার সততা ও রাজনৈতিক বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে মতিন-কামরুলের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। নতুন করে জেলা আ.লীগের হিরু এবং মতিন-কামরুল গ্রুপের সৃষ্টি হয়। পরে মতিন-কামরুল জেলার আরেক সাংসদ নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর মতিন-কামরুল শিল্পমন্ত্রীর ওপর ভর করেন। এতে করে জেলা আ.লীগের নতুন দু’গ্রুপের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রুপ নেয়। মতিন-কামরুলপন্থীরা জেলা আ.লীগ অফিস দখলে রাখেন। দলের কর্মসূচিগুলোতে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পালন এবং মঞ্চে একে অপরের উদ্দেশ্যে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী কাজে লিপ্ত হওয়ায় বাংলাদেশ আ.লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জেলা আ.লীগের সভাপতি মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু (বীর প্রতীক) ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঁইয়াকে তাদের স্বীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেন এবং একই সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জি এম তালেবকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পীরজাদা কাজী মোঃ আলীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করেন। তারা দায়িত্ব পাওয়ার পর অনেকেই আশা করেছিল তারা গ্রুপিং, লবিংয়ে না জড়িয়ে জেলা আ.লীগকে ঐক্যবদ্ধ করবেন। কিন্তু তারা তা না করে মতিন-কামরুল গ্রুপের পক্ষ নিয়ে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বকে আরও বেশি বেগবান করে তুলেন। তারা একটি পক্ষকে (মতিন-কামরুল) খুশি রাখার জন্য ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের (রাজু-হিরুপন্থী) বেশকিছু নেতাকে বহিষ্কার করেন। এতে করে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। জেলা আ.লীগের দ্বন্দ্বকে মিটানোর জন্য কেন্দ্রীয় আ.লীগ ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা আ. লীগের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করেন। সম্মেলনে তৃণমূলের মতামত ও যোগ্য নেতাদের পাশকাটিয়ে দুজনকে ভারমুক্ত করে দেওয়া হয়। এতে করে তৃণমূল নেতাদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়। জেলা পরিষদের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া (মতিন-কামরুল) পন্থী জেলা আ.লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন ভূঁইয়া কাপ-পিরিচ নিয়ে শহর আ.লীগের বহিস্কৃত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী মনির হোসেন ভূঁইয়া আনারস প্রতীককের নিকট বিপুল ভোটে পরাজিত হয়। তার এবিজয় তৃণমূল আ.লীগের বিজয় বলে মনে করেন তৃণমূল নেতারা। জেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মনির হোসেন ভূঁইয়া জয়লাভ করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিভিন্ন পোস্টে লক্ষ্য করা যায়। সদ্য নির্বাচিত চেয়ারম্যান মনির হোসেন ভূঁইয়া নবনির্বাচিত জেলা আ.লীগের সভাপতি জি এম তালেব হোসেনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন। মূহুর্তের মধ্যে তা ভাইরাল হলে মতিন-কামরুলপন্থীদের মাঝে দেখা দেয় ক্ষোভ ও হতাশা। তারাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ছবি ও লেখা পোস্ট করেন। এবিষয়ে কামরুলপন্থী একনেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এগুলো নিছক নাটক। জেলা ও শহর আওয়ামী লীগ আগের মতো এখনও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী।
নির্বাচিত চেয়ারম্যান মনির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আমি আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কর্মী। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ বুক ধারণ করি। আজ যারা আমাকে ভোট দিয়ে জেলা পরিষদের সম্মানিত চেয়ারে বসিয়েছেন তারাই মমতাময়ী মা জননেত্রী শেখ হাসিনার মাঠ পর্যায়ের কর্মী। আমি নির্বাচিত হয়ে প্রথমে আমার দলের নেতা জেলা আ.লীগের সভাপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করি এবং ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময় করি। একজন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি জেলা আ.লীগকে সুসংগঠিত করার জন্য সবাইকে নিয়ে কাজ করে যাবো এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে তুলবো (ইনশাআল্লাহ)। জেলার প্রবীন এক রাজনৈতিক নেতা বলেন, এখানে খারাপ বা অন্যকিছু দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে এমন একটা দিনের অপেক্ষায় ছিল অবহেলিত নেতাকর্মীরা। আমি মনে করি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনির হোসেন ভূঁইয়া একজন নিরহংকার ও সততার প্রতীক। তিনি নির্বাচিত হয়েই প্রথমে শুভেচ্ছা জানালেন জেলা আ.লীগের সভাপতিকে। এটা দলের জন্য মঙ্গল। দৃষ্টিভঙ্গি বদলান। সকল গ্রুপিংয়ের ঊর্ধ্বে থেকে দলকে সুসংগঠিত করে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে তাহলেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। জনসাধারণের জনমতে, এটাকে ভাল হিসেবেই গ্রহণ করছেন তারা। তারাও চাচ্ছেন, দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের অবসান হোক। তাদের ধারণা কিছু স্বার্থান্বেষী মহল দলের দ্বন্দ্বের অবসান হোক তা তারা চায় না। এতে করে জেলা আ.লীগ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে দ্রুত এর অবসান থেকে দলকে বের হয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন।
%d bloggers like this: