কলাম : পুরুষত্তাম ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী অনুধ্যান।


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৩, ৮:২১ অপরাহ্ণ / ৬০
কলাম :  পুরুষত্তাম ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী অনুধ্যান।

প্রণব মন্ডল, কবি এবং শিক্ষার্থী।

সেই সময় ব্রহ্মা, শিব, নারদ ও স্বর্গের সমস্ত দেবতারা অদৃশ্যভাবে কংসের আলয়ে এসে উপস্থিত হলেন এবং সুন্দর সুন্দর শ্লোকের মাধ্যমে তাঁরা ভগবানের মহিমা কীর্তন করতে লাগলেন। এই প্রার্থনাগুলি ভক্তদের অতি প্রিয় এবং এই প্রার্থনা কীর্তন করার ফলে তাঁদের সমস্ত মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। প্রথমেই তাঁরা ভগবানকে সত্যব্রত বলে অভিনন্দন করলেন। ভগবদ্গীতাতে ভগবান বলেছেন, ‘পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ । ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।’ এটি হচ্ছে ভগবানের প্রতিজ্ঞা। দেবতারা বুঝতে পারলেন যে, তাঁর এই প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য পরমেশ্বর ভগবান দেবকীর গর্ভে আশ্রয় নিয়েছেন। তা বুঝতে পেরে দেবতারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন এবং তাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে ‘সত্যং পরম্’ বলে বন্দনা করলেন।

 

দেবতারা ভগবানের স্তব করতে লাগলেন, “এখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই জগৎ পালন করার জন্য আবির্ভূত হচ্ছেন।”

দেবতারা প্রার্থনা করলেন, “হে প্রিয়তম ভগবান, পরমপুরুষরূপে তোমার শাশ্বত স্বরূপ উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন। মানুষ সাধারণত তোমার প্রকৃত রূপ যে কি তা জানতে পারে না। তাই তুমি স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে তোমার নিত্য শাশ্বত আদি রূপ প্রদর্শন করাবার জন্য অবতরণ করছ। তোমার বিভিন্ন অবতারের কথা মানুষেরা বুঝতে পারে কিন্তু তোমার আদি রূপ নরাকার দ্বিভুজ মূর্তিরূপে তুমি যখন সাধারণ মানুষের মতো লীলাবিলাস কর, তখন তারা তা বুঝতে পারে না। ভক্তকে আনন্দ দেওয়ার জন্য তোমার এই শাশ্বত রূপ নিত্য বর্ধিত হচ্ছে। কিন্তু অভক্তদের কাছে এই রূপ অতি ভয়ংকর। হে অরবিন্দাক্ষ, তুমিই হচ্ছ শুদ্ধ সত্ত্বের উৎস। অনেক মহর্ষি সমাধিমগ্ন হয়ে বা তোমার চরণারবিন্দের ধ্যান করে তোমার চিন্তায় মগ্ন হয়ে অনায়াসে এই ভবসমুদ্রকে গোষ্পদে পরিণত করেছে। হে জ্যোতির্ময়, যে সমস্ত মহাত্মারা তোমার চরণারবিন্দরূপী তরণীকে আশ্রয় করে এই অজ্ঞান-সমুদ্র পার হয়েছেন, তাঁরা সেই তরণী তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে যাননি, তা এখনও পারেই রয়েছে।” দেবতারা এখানে একটা খুব সুন্দর দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, কেউ যখন নৌকায় করে নদী পার হয়, তখন তার সঙ্গে সঙ্গে নৌকাটাও নদীর ওপারে যায়। তা হলে যারা এপারে রয়ে গেল, তারা পার হবে কি করে? দেবতারা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁদের প্রার্থনায় বলছেন যে, ভবসাগর পার হয়ে গেছেন যে সমস্ত মহাত্মা, তাঁরা সেই নৌকাটি তাঁদের সঙ্গে নিয়ে যান না। ভক্ত যখন এই ভবসমুদ্র পার হওয়ার জন্য সেই নৌকাটির কাছে যান, তখন বিশাল ভবসমুদ্র ছোট্ট হয়ে একটা গোষ্পদের মতো হয়ে যায়। তাই ভক্তকে নৌকাটা অপর পারে নিয়ে যেতে হয় না—তাঁরা তৎক্ষণাৎ সেই সমুদ্র পার হয়ে যান। ভগবানের ভক্তরা যেহেতু অন্য জীবের প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরবশ, তাই তাঁরা ভগবানের চরণারবিন্দেই সেই নৌকাটি রেখে দেন। যে কেউ ভগবানের চরণারবিন্দের ধ্যান করতে পারেন এবং তার ফলে তাঁরা অনায়াসেই এই ভবসমুদ্র পার হতে পারেন।

দেবতারা তাই তাদের উন্নত জ্ঞানের মাধ্যমে প্রচার করছেন যে, যারা ভগবানের চরণারবিন্দ ছাড়া অন্য কিছুর ধ্যান করে, তারা কখনই ভবসমুদ্র পার হতে পারে না। তারা কেবল কল্পনা করে যে, তারা মুক্ত হয়ে গেছে। “হে কমলনয়ন ভগবান, তাদের মনোবৃত্তি কলুষিত হয়ে গেছে, কেননা তারা তোমার চরণারবিন্দের ধ্যান করতে পারেনি।”

ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে যে, নির্বিশেষবাদীদের পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে হলে অনেক ক্লেশ সহ্য করতে হয়। শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথমেও বলা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভক্তিপরায়ণ না হলে কর্মফলের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। এই বিষয়ে ভগবদ্‌গীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন এবং শ্রীমদ্ভাগবতে দেবর্ষি নারদের উক্তি রয়েছে, আর এখানে দেবতারাও সেই সত্যেরই পুনরাবৃত্তি করছেন—“যারা তোমার চরণারবিন্দে ভক্তিপরায়ণ হতে পারেনি, তারা তোমার অনুগ্রহ লাভ করতে পারে না এবং তাদের পরম উদ্দেশ্য সাধিত হয় না।