ছোট গল্পঃ সোনা হারা। অর্থাৎ যে ,সোনা হারিয়েছে।


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২, ৬:০২ অপরাহ্ণ / ১৩৯
ছোট গল্পঃ সোনা হারা। অর্থাৎ যে ,সোনা হারিয়েছে।
 মুহাম্মদ রুম্মান ইসলাম
ফসলি মাঠের পাশে ছোট একটি মাটির বাড়ি।গ্রামের প্রান্তিক দরিদ্র চাষীরাদের, যেরকম ঘর হয় আর কি। নাম,বেলাল হোসেন। ঘরে দুই কন্যা সন্তান,আর তার স্ত্রী। এই নিয়ে তার সংসার। গ্রামের মানুষ “তাকে (মরা) বলে ডাকে”। শরীর জীর্ণশীর্ণ-শুকনা যার কারণে গ্রামের মানুষ” এরকম নাম দিয়েছে। তাছাড়া প্রত্যেক গ্রামে, শহরে ও মানুষকে এরকম নকল নামে ডাকা হয়। ব্যক্তির পরিস্থিতি বা আচরণের উপর ভর করে।
মরা, কৃষক মানুষ। কার্তিক মাস প্রায় শেষ, মাঠে মাঠে চাষিরা আলুর বীজ রোপন শুরু করেছে। তার যেনো চিন্তার শেষ নেই। সেও কবে, আলুর বীজ রোপন করবে, প্রস্তুতির একটা ব্যাপার আছে।গ্রামের কৃষক মানুষদের কাছে, টাকা- পয়সা সব সময় থাকে না। তার অবশ্য দু’টা হালের বলদ আছে। আর বাড়ির পাশে এক টুকরো ফসলি জমি। যদি অন্য কোথাও মিলে যায় ,মানুষের জমি বর্গা চাষ করে । চাষের উপর তার সংসার নির্ভর করে। কার্তিক মাস শেষের দিকে, সবেমাত্র শীত পড়তে শুরু করেছে।তবে দুই একদিন ধরে মোটামুটি ভালই শিত লাগছে। বেলাল হোসেন,প্রতিদিনই ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে।
তারপর অন্যান্য কাজ যা থাকে… করে। একদিন ভোরে নামাজ শেষে।আলুর বীজ রোপনের উদ্দেশ্যে ,জমি প্রস্তুত করার জন্য। হালের বলদ দিয়ে, জমি চাষ শুরু করেছে। শীতের সকাল বেশ ভালই ঠান্ডা লাগছে। কিছুক্ষণ হাল চাষ করার পর, আর শীত লাগছে না।
গরু গুলো আজ বেশ জোরে হাঁটছে। মনে হয় তারা ও শরীর গরম করছে শীতকে দূরে রাখার জন্য।
 অসুবিধা হলো জমির, একপাশে পশ্চিম দিকে আগে উঁচু ছিল।সেখানে ঝোপঝাড় ছিল। এখানে কোনো ফসল ফলতো না। তাই মাটি কেটে জমি একটু নিচু করা হয়েছে। ঝোপঝাড় রেখে কি লাভ? কিন্তু এক পাশে জমির এক কোনায়, পশ্চিম দিকে একটু উঁচু রয়েই গেছে। আগের মানুষজন জমির সীমানা নির্ধারণ করার জন্য। নিশিন্দা নামের, এক ধরনের গাছ লাগাতো। এই নিশিন্দা গাছ, অঞ্চল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। উঁচু ঢিপির ওপর নিশিন্দা গাছ আছে বলে,সীমানা বোঝা যায়। যার জন্য উঁচু ঢিপি রয়েই গেছে।
 মরার, হালের বলদ সেখানে গিয়ে ঘুরতে গেলে ,বেশ কষ্ট হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা না থাকায়, স্বল্প জায়গার মধ্যে ঘুরতে গিয়ে থেমে যায়।
 যারা, হাল- চাষ দেখেছেন অথবা করেছেন।তারা হয়তো বুঝতে পারছেন, অসুবিধাটা কেমন হয়। যদি সংকীর্ণ জায়গার মধ্যে, হাল চাষ করতে হয় ব্যাপারটা বেশ বিরক্তের।
বেলাল হোসেন, (মরা) ধুর গাছ লাগিয়ে ,সীমানা নির্ধারণের পদ্ধতি প্রাচীন। এখন আধুনিক পদ্ধতি এসেছে এটা রেখে লাভ কি।বাজার থেকে একটা সিমেন্টের খুঁটি নিয়ে এসে, এখানে বসিয়ে দিব। আর সেটা যদি করি, আমি বাড়তি কিছু ফসল এখানে ফলাতে পারব। আইডিয়াটা তার পছন্দ হলো, যুক্তিটা মন্দ না।
সে, হালের বলদ গুলোকে ,গাছের সঙ্গে বেঁধে পাশেই বাড়ি, বাড়ি থেকে কোদাল নিয়ে এসে। উঁচু ঢিপি কাটতে শুরু করল। মাটির উঁচু স্থান কাটতে গিয়ে,কোদাল যেন কোন কিছুর সঙ্গে বেধে যাচ্ছে, ঠংঠং শব্দ ও হচ্ছে। যখন সে, ভালো করে লক্ষ্য করল, মনে হচ্ছে পাতিলের মত কিছু একটা।
বেলাল হোসেন (মরা) উপরের মাটি যখন সম্পন্ন উন্মুক্ত করলো।বুঝতে পারলো এটা পাতিল নয়।
তবে পাতিলের মতো দেখতে কলস।
বেশ ওজন কেজি দুই তো হবেই।কলসের গায়ে খোদাই করে ফুল লতাপাতা আঁকানো।বেশ পুরনো অনেক আগের তৈরি। দীর্ঘ সময় মাটির ভিতরে পড়ে আছে। যার জন্য কলসের রং অন্যরকম হয়ে গেছে।
এবং কলসের গায়ে মাটি লেগে থাকায় চেনাই যায় না, এটা কোন ধাতু। তাছাড়া মরা, গ্রামের সাধারণ কৃষক, তার এত কিছু বোঝার সামর্থ্য নেই। সে ,মনে মনে ভাবল,বাবা দাদার মুখে শুনেছি, এখানে আগে রাজা জমিদাররা ছিল।
 তার জমি থেকে খানিকটা দূরে, দালানের সামান্য কিছু, দেওয়াল এখনো টিকে আছে। যা দেখে বোঝা যায় এখানে আগে বিশাল কোন অট্টালিকা ছিল।
হবে হয়তো তাদের হব্যবহারের কাঁসা-পিতলের কোন কলস।
রাজা জমিদারদের প্রাসাদ চাপা পড়েছে।আর কলস তো সামান্য ব্যাপার। কলস তার চাষ জমিতে রেখেই, বাকি কাজ শেষ করে। বেলাল হোসেন (মরা) কলস নিয়ে নিজের ঘরে ফিরলো।
মরা, বাড়িতে এসে ক্ষণিক চমকে গেল। যেনো সে ভূত দেখেছে। আসলে না সে ভূত দেখেনি তার বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছে। শশুর, তাকে জিজ্ঞাসা করল, বেলাল তোমার হাতে কি? বেলাল কলসের ঘটনা খুলে বলল। শশুর মশাই কলস হাতে নিয়ে দেখতে থাকলো। কিন্তু বেলালের, ভাবনা অন্য কিছু,এমনিতে নাই খাই সংসার। আলুর বীজ রোপনের জন্য,পয়সা-কড়ি গোছাতেই বেশ কষ্ট হয়েছে।
এর মধ্যে আবার শশুর-শাশুড়ি এসেছে। হাজার হলেও গুরুজন মানুষ শ্বশুর-শাশুড়ি। তাদের তো আপ্যায়ন করতে হবে। কিন্তু হাত তো একদম খালি। মরা, চিন্তা করতে করতে, বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করতে গেল। প্রচণ্ড খিদা লেগেছে এতক্ষণ সে হাল চাষ করে এসেছে। গোসল শেষে তার বউকে ডাকছে, জোছনা, এই জোছনা। আমাকে খেতে দাও আমার খুব খিদা লেগেছে। তার বউ এর নাম, জোছনা। কিন্তু জোছনা তার কোনো কথার উত্তর দিচ্ছে না। বেশ কয়েকবার ডকার পর, সে বুঝে গেল।জোছনা হয়তো অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত। তাই নিজেই খাবারের পাতিল থেকে, ভাত-তরকারি উঠিয়ে খেতে শুরু করলো। কিন্তু খেতে বসে ঠিকমতো খেতেও পারছে না, পেটে খিদা আছে।কৃষক মানুষের যেমন, খিদা হয় আর কি। তবে সে খেতে পারছে না । শুধু মাথায় এখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।মেহমানদের কিভাবে আপ্যায়ন করে বিদায় করা যায়।
 হঠাৎই মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। জ্যৈষ্ঠ মাসে নতুন ধান বাড়িতে তুলেছিলাম।যেটুকু ধান, ছিল কবেই ফুরিয়ে গেছে।ঘরে ধান, উঠার ১৫ দিনের মধ্যেই শেষ। বাজারে ব্যবসায়ীর কাছে ধান বিক্রি করে, সংসারের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটাতে হয়েছে।
তবে কিছু ধান,খাওয়ার জন্য ধানকল থেকে ভাঙ্গিয়ে, চাউল করে ঘরে রেখে ছিল। চাউল এখনো আছে তবে সেটাও কবে জানি শেষ হয়ে যায়। চাউল শেষ হলে,তখন তাকে আরেক বিপাকে পড়তে হবে। ঘরে বউ-বাচ্চা আছে, চাউল টুকু বিক্রি করলে তাদের সবাইকে অনেক কষ্ট করতে হবে। না না এটা করা যাবে না।
তখনই মাথায় আরেকটা বুদ্ধি আসলো,ধানের গুড়া গুলো তো আছে। গুড়া গুলো বিক্রয় করলে হালের বলদ, দু’টার কষ্ট হবে। তবে সেটা সে ম্যানেজ করে নিতে পারবে। মাঠ থেকে না হয় বেশি করে ঘাস কাটবে। আশেপাশের ঝোপঝাড় জঙ্গল থেকে।লতাপাতা নিয়ে এসে চালিয়ে দেওয়া যাবে। বলদ গুলো তো, আর মানুষ না। জোছনার মত আমাকে কিছু বলতে পারবে না।
সে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে, পরিকল্পনা মত ঘর থেকে। গুড়ার, বস্তা কাঁধে উঠিয়ে বাজারের দিকে রওনা করবে,এমন সময় মনে হলো গুড়ার ওজন কতখানি হবে।বড়জোর ৩০ কেজি, বাজারে গুড়ার যে দাম।
১০ টাকার বেশি হবে না। ১০ টাকা করে কেজি হলে, ৩০০ টাকা পাবো। ৩০০ টাকা দিয়ে কি বাজার সাদায় করতে পারবো। তখনই চোখের সামনে দেখতে পেলো, সেই কলস।যেটা সে আলুর জমিতে পেয়েছে। ধুর এটা ঘরে রেখে কি করবো।এটা রেখে আমার কোন কাজ নেই। কলসের আকার আরেকটু বড়সড় যদি হতো, ঘরে রেখে পানি খেতে পারতাম। যাই দেখি এটাও বাজারে বিক্রি করতে পারি কিনা। এই বলে কলস, গুড়ার বস্তার মধ্যে ভরে নিল। এবং দ্রুতগতিতে বাজারের দিকে রওনা দিল। প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে, শশুর-শাশুড়িকে, আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারের,পাশে বড় এক রাইস মিল। রাইস মিলের মালিক খান সাহেব।
খান সাহেবের নাম কি ,সে জানে না। গ্রামের অনেকেই তার নাম জানে না‌। সবাই খান সাহেব বলে।
খান সাহেব,অনেক ধরনের ব্যবসা করে ।গ্রামের চাষীদের কাছে থেকে ধান, গুড়া, আরো অন্যান্য ফসল ক্রয় করে। মরা, এখানেই সব লেনদেন করে। অন্তত তার চাষের ফসল এই ব্যবসায়ীর কাছেই দিয়ে থাকে। কারণ, ব্যবসায়ী তাকে বলেছে,তুই হাটে তোর ফসল নিয়ে যাবি, পরিবহন খরচ আছে।গরিব মানুষ তুই।
অযথা, বাড়তি খরচ করতে যাবি কেন ? তোর ফসলগুলো আমাকে দিলে, আমি তোকে কোনদিন ঠকাবো না। তোর পরিবহন ভাড়াটা লাগবে না।
বেলাল হোসেন ( মরা) চিন্তাভাবনা করে দেখেছে ব্যবসায়ীর কথায় যুক্তি আছে। তাই সে, হাটে ফসল নিয়ে যায় না। বাড়ির কাছে যে বাজার, এখানে মাছ তরি-তরকারি অন্যান্য সামগ্রী পাওয়া যায়। কিন্তু এই বাজারে ধান, গম , পাট, সরিষা, গরু, ছাগল, এগুলোর হাট লাগে না।এগুলো বিক্রয় করতে হলে, ভ্যান ভাড়া করে । অন্তত ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে যেতে হয়, বড় কোন হাটে।
রাইস মিলের সামনে বড়সড়ো একটা গেট, গেটে দারোয়ান ও আছে। দারোয়ান মরার, ঘাড়ে বস্তা দেখে চটজলদি করে, গেট খুলে দিল। মরা, রাইস মিলের ভিতরে প্রবেশ করে। ধানের, গুড়া ওজন করার আগে ঘাড় থেকে বস্তা নামিয়ে। তারপর বস্তা থেকে, কলস বের করে ,খান সাহেবকে দেখালো। আর কলস কিভাবে পেয়েছে, সেই ঘটনাও তাকে খুলে বললো।
খান সাহেব, তাকে বলল তুমি, গুড়া আগে ওজন করো। পরে, কলসের ব্যাপারটা মিটাতে পারবে।
মরা, আজকে খান সাহেবের কথা শুনে অবাক!
 খান সাহেবকে, আজকে খুব খুশি খুশি মনে হচ্ছে!
খান সাহেব, কোনদিন বেলাল হোসেন (মরা)কে তুমি বলেনি!
মরা , গুড়া ওজন শেষ করে বলল, খান সাহেব আমার গুড়ার ওজন হয়েছে ৩৫ কেজি। খান সাহেব, তাকে ডাক দিল, এদিকে এসো বেলাল। বাজারে, এখন গুড়া কত করে কেজি? মরা, উত্তর দিল খান সাহেব ১০ টাকা করে।
খান সাহেব,কোনদিন বেলালকে, মরা ছাড়া ডাকে না।আজকে আসল নাম ধরে ডেকেছে।
খান সাহেব, বলল আজকে তোমাকে আমি গুড়া ১২ টাকা করে কেজি দিলাম। তাহলে তোমার গুড়ার দাম হয় ৪২০ টাকা । আর এই কলসের জন্য দিলাম আরো ৪২০ টাকা যাও। তুমি আমার গ্রামের মানুষ,
 আমার কাছে সব সময় ফসল, বিক্রি করে থাকো। আজকে না হয় তোমাকে, কিছু টাকা ধরেয় দিলাম।
মরা, লক্ষ্য করল খান সাহেবকে, আজকে বেশ অন্যরকম লাগছে।
খুব আনন্দে আছে! এর আগে খান সাহেব, তার সঙ্গে এরকম ব্যবহার কোনদিন করেনি। কিন্তু মরার, এত কিছু… ভাবার সময় নেই বাড়িতে মেহমান।
বাজার সদায় নিয়ে গেলে তারপর রান্না বাড়া।
 সে বাজার থেকে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে,
 দ্রুতই বাড়ির দিকে রওনা হলো।
মরা, পথে যেতে যেতে ভাবছে, কলস যদি না পেতাম।তাহলে আজকে শশুর-শাশুড়ির কাছে ছোট হয়ে যেতাম। আল্লাহই মান রাখে। মরা, বাড়িতে প্রবেশ করে বাজার সদায় রাখতেই, জোছনা তার সামনে এসে হাজির ।আজকে জোছনার মুখে ও যেন, চাঁদের জোছনা ঝরছে। জোছনাকে বিয়ের পর থেকে এরকম, হাসিখুশি চঞ্চলতা তার মাঝে, কখনোই দাখেনি। আজকে যেন সত্যিই মরার ,ঘরে জোছনা ঝরছে। জোছনা, প্রচন্ড আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসের মাঝে বলছে, শোনো সুমাইয়ার আব্বা ।”সুমাইয়া তাদের বড় মেয়ের নাম”।আমার আব্বা-আম্মা এসেছিল, চলে গেছে। আমার ভাই, অ্যাক্সিডেন্ট করেছে এখন সদর হসপিটালে ভর্তি আছে । আব্বা সেই খবর শুনে চলে গেছে। তুমি আমার ভাইয়ের জন্য দোয়া কর, সে যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়। মরা, রেগে উচ্চস্বরে বলল এই জোছনা,পাগলি হয়েছে নাকি। তোমার ভাই অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।আর তোমার হাসি আনন্দ যেন ধরছে না। কেমন বোন তুমি ? জোছনা একটু থেমে গিয়ে বলল, আরে শোনো না। তুমি যখন গোসল করতে গিয়েছিলে। তখন আমি আর আমার আব্বা।
তুমি আমাদের আলুর জমিতে, যে কলস পেয়েছো সেটা দেখেছি।
আব্বা,বলেছে এই কলস সোনার। আমাদের আর আগের মত দিন থাকবে না।আমরা অনেক ধনী হয়ে যাব। আমাদের এটা থাকবে,ওটা থাকবে এটা করবো ওটা করবো। আরো নানান কথা জোছনা বলেই যাচ্ছে। ভাই এক্সিডেন্ট করেছে তাই, আব্বা-আম্মা মোবাইলে খবর পেয়ে আপাতত চলে গেছে। আমিও তাদের সঙ্গে তাদেরকে ,এগিয়ে দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ঘরে এসে দেখি তুমি নেই। কলস ও দেখছি না ,কোথায় রেখেছো? বিকেল বেলা আব্বা , আবার আসবে।জানোই তো আমার আব্বা, সোনার পট্টিতে চায়ের দোকান করে ।অনেক সোনা ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার পরিচয় আছে । তুমি যে, কলস পেয়েছো সেটা আমার আব্বা তোমাকে, সঙ্গে নিয়ে বিক্রি করে দিবে।
মরা,তো চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো, চুপ করে বসে জোছনার কথা অবাক হয়ে শুনছে। আর মনে মনে ভাবছে ,হায় এটা আমি কি করলাম। পাওয়া ধন, হারিয়ে ফেললাম। কিন্তু জোছনার মুখে যেন, কথা ফুরাচ্ছেই না। মরা, যে কিভাবে জোছনাকে ,ঘটনা খুলে বলবে সেটাও বুঝতে পারছে না। অবশেষে মরা,জোছনাকে সম্পন্ন ঘটনা খুলে বলল। মুহূর্তেই ভরা পূর্ণিমার চাঁদ যেন,জোছনা ছড়ানো বন্ধ করে। অমাবস্যার কাল রাত্রে পরিণত হয়েছে। রীতিমতো বিলাপ শুরু করে দিয়েছে। যে নারী, ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে শুনেও, ধনী হওয়ার আশায় মুখ দিয়ে জোছনা ছড়িয়েছে। নিমিষের মধ্যেই আশা ভঙ্গ হওয়ার কারণে,উল্টো রূপ ধারণ করেছে। এবং মরাকে, দোষারোপ শুরু করেছে। জোছনা,কান্না করছে আর, জোরে জোরে বলছে। তুমি যাও খান সাহেবের কাছে। যেভাবেই পারো দরকার হয়, হাতে পায়ে ধরে হলেও, তুমি আমাদের সোনার কলস, ফিরিয়ে নিয়ে আসো। মরা ,বউয়ের কথা শুনে খুব তাড়াতাড়ি,
খান সাহেবের, রাইস মিলে চলে আসলো।মরা,এসে দেখতে পেল খান সাহেব, এক চেয়ারের উপর বসে আছে। আরেক চেয়ারের উপর পা দিয়ে, মনের সুখে পান খাচ্ছে। আর গুনগুন করে কি যেন বলছে। বোঝা যাচ্ছে না ঠিক গান গাচ্ছে না অন্য কিছু। মরাকে, দেখে খান সাহেব,বলছে আরে মরা তুই আবার আসলি ?
মরা, বলছে খান সাহেব,আমার কলস আমাকে ফিরিয়ে দিন।
খান সাহেব, যেন আকাশ থেকে পড়ল ,কলস কিসের কলস? খান সাহেব,সোনার কলস আমি চিনতে পারিনি। ভুল করে গুড়ার দামে, সোনা বিক্রি করেছি। আরো দুই একটা কথা বলতেই।খান সাহেব, এবার ধান ভাঙ্গা কলের মত গর্জে উঠলো। যেন মরার, খোসা ও ধানের মত ছুঁলে ফেলবে।
মরা, খান সাহেবের রাগের ক্রোধের অনেক, ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী। মরার, চোখের সামনেই খান সাহেব, তার লোকজন দিয়ে, গ্রামের অনেক মানুষকে পিটিয়েছে।টাক-পয়সা পাওনার জের ধরে।
তবে, আজকে মনে হচ্ছে খান সাহেবের, অন্য কোনো লোকের প্রয়োজন নেই। সে নিজেই যথেষ্ট। খান সাহেব, বেশ উচা লম্বা প্রায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চি। এইরকম বিশাল শরীরের একটা আঘাত যদি, মরার গায়ে লাগে।
তাহলে ,সোনার কলস ফিরে পাওয়া তো, অনেক দূরের বিষয়।
নিজের, আপন সোনা জীবন সেটাও হারিয়ে যাবে।
মরা, খান সাহেবের বিষয়ে খুব ভালো করেই জানে। তাছাড়া মরার কোন সাক্ষী ও নেই। আর সাক্ষী থাকলেও খান সাহেবের, বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষী দিত না। খান সাহেব, যখন গ্রামের অন্য চাষীদেরকে ,পিটায়তো কেউ থামাইতো না। এমনকি কেউ কোনো প্রশ্ন ও করত না।
তাই সোনার কলসের আশা রেখে। নিজের সোনা জীবন নিয়ে, বেলাল হোসেন (মরা)সেখান থেকে চলে আসে।
বাড়িতে এসে দেখে, বউ এখনো কান্না করছে। এবং স্বামীকে নানান ভাবে দোষারোপ করছে।
মরাকে দেখে জোছনা, বেশ উচ্চস্বরে বলছে ,কি হলো কলস পেয়েছো?
 মরা, খান সাহেবের, রাইস মিলে কি কি ঘটনা ঘটেছে, সব খুলে বলল। এবং আরো বললো আমি যদি, সেখানে আরেকটু সময় নিয়ে।
সোনার, কলসের দাবি করতাম। তাহলে সোনার কলস তো দূরের কথা, আমার জীবনটাই থাকতো না।
জোছনার, হাতের কাছে একটি প্লাস্টিকের বালতি ছিল।
জোছনা ,বালতি আছাড় মেরে বলছে, সেটাই ভালো হতো।
তোমার মত মরা, স্বামী থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।
যে , গুড়ার দামে সোনা বিক্রি করে, তার মত বোকা বেঁচে না থাকাই ভালো। আমি আর তোমার সংসারে থাকতে পারবো না। যে, সোনা চেনে না আমি এরকম বোকা মানুষের ,সংসার করবো না। আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে ছিল, সেটাও তুমি হারিয়ে ফেললে।
মরা, এবার রাগ অভিমান নিয়ে, বলতে লাগলো হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ। আমি সোনা চিনি না,আমি সোনা চিনি না।
আমি জীবনে অনেক সোনা হারিয়েছি ,যখন আমি একটু বড় হয়েছি।গায়ে গতরে খাটতে শিখেছি, তখন থেকে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে, মাঠে সোনা ফলিয়েছি। এবং তা বিক্রি করেছি , সমাজের উচ্চবিত্ত খান সাহেবদের কাছে, খোসার দামে।
সোনার সঠিক দাম, কোনদিন উচ্চস্বরে চাইতে ও পারিনি।
তুমি আজকে, যে সোনার মোহে পড়ে, উচ্চবিলাসী স্বপ্ন দেখেছো। তার চেয়েও হাজার গুন দামি সোন,
সারা বছর আমার ফসলি মাঠে আমি ফলায়। এবং তা আমি হারিয়ে ফেলি।
আমরা মরা নামের কৃষকদের, নুন আনতে পান্তা ফুরায়।
আমরা নুন ক্রয় করি, সোনার দামে আর সোনা বিক্রি করি খোসার দামে।
মরা এবং জোছনা, যেখানে কথা বলছিল। সেখানেই তাদের মাটির ঘরের ,জানালা খড় দিয়ে বাঁধানো।
মরা, জানালার খড় হাত দিয়ে ধরে বলছে ,
জোছনা এই আমার ঘরে ,যে খড় দেখছো, এটার কালার সোনার কালারের মতই।
আমি সারা জীবন সোনা উৎপন্ন করেছি, আর ছিটিয়ে দিয়েছি এই খড়ের মাঝে।
সমাজের উচ্চবিত্ত সাহেবরা, আমার সোনা গুলো, খড়ের দামে ক্রয় করেছে।
আমার ঘরে এই খড় সোনা মানায় জোছনা।যাদের ঘরে ধাতু সোনা মানায়। তারা তাদের ঘরে সোনা সাজিয়ে রাখুক। আমি আমার ঘরে এই খড় সোনা সাজিয়ে রাখবো।ঐ যে ,ঘরের উপরে ফুটা চালা দেখছো, ঐ ফুটা চালা দিয়ে জোছনা ঝরে। যদি কোনদিন ঐ ফুটা চালা দিয়ে, জোছনা ঝরা বন্ধ হয়ে যায়।
আমি সেই জোসনা ছাড়া ও থাকতে পারবো।
তুমি যেতে পারো,আমি হারিয়ে অভ্যস্ত।
জোসনা তার স্বামীকে, তার সংসারকে অনেক ভালোবাসে।
কিন্তু ক্ষণিকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে মাতাল করে তুলেছিল। জোছনা স্বামীর সংসার ছেড়ে ,হয়তো সাত দিন ও বাবার বাড়িতে থাকতে পারতো না।
স্বামীর আবেগী কথা গুলো শুনে, তার নারী মন মুহূর্তেই ভালোবাসাতে ভরে উঠেছে। জোছনা কান্না কন্ঠে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে। বলতে থাকে তোমার জোছনা কোথাও যাবে না,কোথাও যাবে না। নিমিষেই তাদের আক্ষেপ ত্যাগের ভালোবাসাতে পরিপূর্ণ।
তবে, মরা নামের সেই কৃষক, এখনো সোনা ফালায়। আর ছিটিয়ে দেয় খড়ের মাঝে।
কিন্তু মরার ,সোনা কখনোই খড়ের মূল্য বাড়াতে পারে না।
আমার জীবনে প্রথম লেখা গল্প এটি ।গল্পের মাঝে বানান, এবং বিরাম চিহ্নের সঠিক ব্যবহার ভুল থাকতে পারে। তার জন্য আপনাদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। তবে আমি আশা করছি গল্পের কাহিনী,সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছি।