ArabicBengaliEnglishHindi

ছোট গল্পঃ শরৎ উৎসব


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১২, ২০২২, ১:৪৮ অপরাহ্ণ / ৪৭
ছোট গল্পঃ শরৎ উৎসব

রাহেলা আক্তার 

ঋতু পরিক্রমার তৃতীয় ঋতু শরৎ কাল। ভাদ্র ও আশ্বিন মাস নিয়ে শরৎঋতু। কাশফুল, শিউলি, স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না,আলোছায়ার খেলা দিনভর এইসব মিলেই শরৎ। শরৎকে বলা হয় শুভ্রতার প্রতীক। ভাদ্রের শুরু থেকেই শরতের আবির্ভাব। শরতের স্নিগ্ধতা এক কথায় অসাধারণ! জলহারা শুভ্র মেঘের দল যখন নীল,নির্জন, নির্মল আকাশে পদসঞ্চার করে তখন আমরা বুঝতে পারি প্রকৃতিতে শরৎ এসেছে। শরতের আগমন সত্যিই মধুর। শরতের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো কাশফুল!
নদীর তীরে বনের প্রান্তে কাশফুলের রাশি রাশি অপরুপ শোভা ছড়ায় । কাশফুলের এ অপরুপ সৌন্দর্য পুলকিত করেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।গাছে গাছে শিউলির মন ভোলানো সুবাসে অনুভূত হয় শরতের ছোঁয়া। শরতের মেঘহীন আকাশে গুচ্ছ গুচ্ছ কাশফুলের মতো সাদা মেঘের ভেলা কেড়ে নেয় মন। শরৎকালে ও বর্ষণ হয়,তবে বর্ষার মতো অবিরাম নয়। বরং শরতের বৃষ্টি মনে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। চারপাশের শুভ্রতার মাঝে বৃষ্টির ফোঁটা যেন আনন্দ বারি!  বৃষ্টি শেষে আবার ও রোদ। দিগন্ত জুড়ে সাতরঙা   হাসি দিয়ে ফুটে ওঠে রংধনু। শরৎ কে বলা হয় ঋতুর রানি। কারণ শরৎকালই বর্ষার হালকা মেঘ শরতের নির্মল আকাশে সাদা সাদা পাল তুলে মনের আনন্দে ভেসে বেড়ায়। দিনের বেলায় শরতের স্নিগ্ধ রোদে গ্রাম- বাংলার মাঠ- ঘাট,নদী – নালা,বড় বড় জলাশয় ঝলমল করে। ফুল, ফল,আর ফসলের দেশ বাংলাদেশের এই ঋতু সবার মনেই আনন্দের সঞ্চার করে। শরতের গ্রাম – বাংলা যেন আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
স্বপ্নের মতো মায়াবী আর ছবির মতো ঝকঝকে। শরৎকে পেয়ে প্রকৃতি আরও সজীব হয়।মৃদৃ বাতাসে নেচে তারা মনের আনন্দ প্রকাশ করে। কচি ধান গুলো আরও সজীব হয়। আশ্বিনের শেষে চাষির মুখে ফুটে উঠবে হাসি।কৃষকের দামাল শিশুরা ধানের গন্ধে উঠোনে গড়াগড়ি যাবে। ধান পাকবে হেমন্তে। শরৎ সেই হৈমন্তিক বাণী শোনায় কৃষকের কানে। শরতের ভোরে কৃষক ধানের জমির আল ধরে হেঁটে যায়। কৃষকের পায়ে শিশির ভেজা ঘাস আর শরীরে ধানগাছের পাতা পরশ বুলায়। শরতের ভোরে শিশিরে ধুয়ে যায়।
মনে হয়
প্রকৃতি যেন সারা রাত স্নান করেছে।মুক্তোর মতো ঘাসের ডগায় সূর্যের আলতো কিরণ ঝলমল করে উঠে শিশির বিন্দু। শিউলি ফুলের পাপড়িতে কেঁপে ওঠে শরতের ভোর। আদর ভুলানো হাওয়ায়, শিরশির দুলুনিতে মুগ্ধ। ভীষণ আরাম লাগে। ঘুম ঘুম আরামে চোখ বুজে আসে।শরতের প্রকৃতি আসলেই মনোমুগ্ধকর। সারা আকাশ জুড়ে মেঘের ওড়াউড়ি। মেঘগুলো যেন উড়তে উড়তে কাত হয়ে যায়। ঢুকে যায় একদল আরেকদলে। কখনো উধাও হয়ে যায়। হারিয়ে যায় শুন্য থেকে। কোনো কোনো মেঘদল নেমে আসে দিগন্ত ছেড়ে। নেমে আসে পাহাড়ের ঢালে। শরতের আকাশ  গাঢ় নীল। তাই শরতের আকাশ ভরা নীলে জেগে ওঠে সমুদ্র। সমুদ্রের বুকে বিছানা পাতে নীল।শরৎ দাঁড়িয়ে থাকে বকুল তলায়। ঝরে পড়া বকুলেরা দেখে।কাছে আসে শরৎ।
বকুলের সৌরভ মেখে নেয়। মেখে নেয় হাতে মুখে গায়ে।শরৎ সুবাসিত হয়। শরতের দুপুর আলোয় ঘাস,ধান,বাঁশঝাড়, খড়ের চালে জমে থাকা শিশির বিন্দু গুলো শুকিয়ে যায়। শরতের দুপুর বড়ই নির্মল।নীরব পাখা মেলে ওড়ে সাদা চিল। মেঘের কাছাকাছি ডানা মেলে শিকারি ঈগল। শরতের বিকেল বড্ডই মায়াবী। রোদ নিজেকে অনেকটা শীতল করে নেয়।মাঠভরা ধানের সবুজে গড়াগড়ি করে শরৎ বিকেল।শরৎ সন্ধ্যায় জমে উঠে কবিতায় আসর,গানের জলসা।পাখিদের গানে গানে শরৎ সন্ধ্যা প্রবেশ করে রাতের ঘরে।ঝিরিঝিরি বাতাস হাত বুলিয়ে যায় প্রকৃতির গায়ে। রাতের শরৎ মানে ভেজা ভেজা ঘুম।
ঘুম ঘুম তারাজ্বলা রাতভর জেগে থাকে জোনাকিরা। শরৎ রাতে আকাশে দেখা দেয় ঘন তারকার বন। জ্বলতে জ্বলতে কত তারা নিভে যায়। শরতের পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্নায় মন ভরে উঠে।কী অপূর্ব সেই দৃশ্য!যা ভোলার নয়। সেই আকাশই হয়ে যায় শরৎ সুদিন। শরৎ এলে বৃক্ষরাজির আড়ালে আবডালে থাকা পাখিরা নতুন প্রানের স্পন্দনে জেগে ওঠে।শরতের আগমনে তাদের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে নতুন করে বাসা ও আশা বোনে। নানা গায়ক পাখির গানে মুখরিত হয়ে ওঠে শরতের পরিবেশ। এ সময় আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল,কোয়েল,বুলবুলিসহ সকল পাখি গান করে। বিশেষত শরৎকালে দোয়েল পাখির শিস শুনতে কী যে ভালো লাগে,তা বলার অপেক্ষা রাখে না।শিশির ভেজা শিউলি বাতাসে মৃদু দোল খাওয়া কাশবনের মঞ্জরি,পদ্ম-শাপলা-শালুকে আচ্ছন্ন জলাভূমি শরতের চিরকালীন রুপ।
ছন্দময়,গতিময় এক অনাবিল শান্তির ঋতু শরৎ। এই শরতে আমাদের মন আন্দোলিত হয় বারবার।তাই শরৎ ঋতুর রানি -শরৎ সুন্দর, শরৎ প্রাণোচ্ছল,শরৎ সজীব।শরতের সাথে জড়িয়ে রয়েছে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। শরতের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,,,,
 “”শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি
             ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি
              শরৎ,তোমার শিশির -ধোয়া কুন্তলে
                বনের পথে- লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে
                 আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি””
শরৎ নিয়ে আরও অনেক কবি কাব্য রচনা করেছেন। শরৎকালে শারদীয় দূর্গা পূজার আয়োজন জানান দেয়। ঢাকের তালে তালে চারিদিকে বাদ্যি  বাজে। সুরের ঝংকার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সত্যিই বিচিত্র রুপ নিয়ে শরৎ আমাদের চেতনায় ধরা দেয়। শরতের মন ভোলানো প্রকৃতিতে মন যে কী চায় তা বোঝা বড়ই মুশকিল! রোদ আর বৃষ্টির লুকোচুরি খেলায় মনেও যেন জমে মেঘ,আবার কখনও হয়ে ওঠে রৌদ্রকরোজ্জ্বল।
শরৎ ঋতুর সব সৌন্দর্যের প্রতীকই চিরন্তর প্রহরী। পথিকদের স্বাগতম জানান দেয় শরৎ ঋতু। শরতের ছোঁয়ায় বাংলাদেশ শুধু সুন্দরই নয়,অপূর্ব, অতুলনীয় ও অসাধারণ সুন্দর হয়ে ওঠে।